Notification

ভারতে রাজনীতির অপরাধীকরণ: নেতা মানে সমাজসেবী, কিন্তু সমাজের গুন্ডাদের কেন নেতা বানানো হয়?

Sahil
7 Min Read

ভারতের গণতন্ত্রকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র বলা হয়, কিন্তু এর মধ্যে একটি গভীর সমস্যা লুকিয়ে আছে—রাজনীতির অপরাধীকরণ। নেতা মানে তো সমাজসেবী, যিনি জনগণের কল্যাণে কাজ করেন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রোজগারের উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেন। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা যায়? অনেক নেতার বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, জমি দখলের মতো গুরুতর অভিযোগ। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (এডিআর)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৫ সালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ৪৫% বিধায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু চিন্তাজনক নয়, এটি আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন সমাজের গুন্ডাদের নেতা বানানো হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা এই প্রতিবেদনে পরিসংখ্যান, কারণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং জনগণের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করব।(adrindia.org)

সমাজসেবী
AI Image Created by Weblips Bangla Team

ভারতের রাজনীতিতে অপরাধীদের প্রবেশ একটি পুরনো সমস্যা, কিন্তু গত কয়েক দশকে এটি আরও তীব্র হয়েছে। ২০০৯ সালে মাত্র ১৪% সাংসদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মামলা ছিল, কিন্তু ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৩১% হয়েছে। তেলেঙ্গানায় তো ৭১% বিধায়কের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ। এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতা নয়, এটি আমাদের সমাজের একটি গভীর ক্ষত। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য দলগুলো ‘উইনেবল’ প্রার্থী খোঁজে, এবং অনেক সময় সেই প্রার্থী হয়ে ওঠে যারা অপরাধের জগতে পাকাপোক্ত। এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা এই সমস্যার গভীরতা বোঝার চেষ্টা করব, যাতে পাঠকরা সচেতন হয়ে উঠতে পারেন।

পরিসংখ্যানের আলোকে রাজনীতির অন্ধকার ছবি

ভারতের রাজনীতিতে অপরাধীকরণের পরিসংখ্যান ভয়াবহ। এডিআর-এর ২০২৫ রিপোর্ট অনুসারে, দেশের ১,৮৬১ জন বিধায়কের মধ্যে ৪৫% এর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে, এবং ২৯% (১,২০৫ জন) গুরুতর অপরাধের অভিযোগে জড়িত। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায়ও চিত্র একই—৬৪৩ জন মন্ত্রীর মধ্যে ৪৭% এর বিরুদ্ধে অপরাধের মামলা, এবং ২৭% গুরুতর অভিযোগ। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ১,৬১৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৬% এর বিরুদ্ধে অপরাধের মামলা, এবং ১০% গুরুতর চার্জ।

উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলোতে এই সমস্যা আরও তীব্র। উত্তরপ্রদেশে ৪০% এর বেশি বিধায়কের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ। বিহারে ৭০% বিধায়ক অপরাধী ব্যাকগ্রাউন্ডের। এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেয় যে, রাজনীতি আর সমাজসেবার ক্ষেত্র নয়, এটি অপরাধীদের সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ১৯% বুথে ‘ভয়ের পরিবেশ’ ছিল, এবং ৫০০-এর বেশি ‘বাহুবলী’কে অস্ত্রসহ ধরা পড়েছে। এই ছবি দেখে মনে হয়, ভোটাররা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন?

কেন অপরাধীরা রাজনীতিতে প্রবেশ করে?

রাজনীতিতে অপরাধীদের প্রবেশের পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ‘মাসল পাওয়ার’ বা বাহুবল। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য দলগুলো এমন প্রার্থী খোঁজে যারা এলাকায় ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে পারে। উত্তরপ্রদেশের মুজাফফরনগর বা বিহারের সিওয়ানের মতো এলাকায় গুন্ডারা বুথ দখল করে, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেয়। দলগুলো তাদের টিকিট দেয় কারণ তারা ‘জয়ের গ্যারান্টি’। যুক্তি সহজ—যে দলের কাছে বেশি ‘দাদা’, সে ভোট লুটবে।

দ্বিতীয়ত, ‘মানি পলিটিক্স’ বা অর্থের খেলা। অপরাধীরা টেন্ডারবাজি, খনি লুট, রিয়েল এস্টেট থেকে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে। নির্বাচন কমিশনের সিলিং ₹৯৫ লক্ষ হলেও, একটি লোকসভা আসনে গড় খরচ ২৫-৩০ কোটি টাকা। এই টাকা পার্টি ফান্ডে যায়, এবং ফলে অপরাধীরা নেতা হয়ে ওঠে। সৎ সমাজসেবকের কাছে এত অর্থ নেই, তাই তারা পিছিয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, জাত-ভোটব্যাঙ্কের ফাঁদ। বিহারে যাদব-বাহুবলী, উত্তরপ্রদেশে ঠাকুর-গুন্ডা—এরা নিজেদের জাতের ‘রক্ষক’ হয়ে ওঠে। ভোটাররা ভয়ে-ভক্তিতে ভোট দেয়। জনসচেতনতার অভাবে এই চক্র চলতে থাকে। মিলান ভাইশনাভের বই ‘হোয়েন ক্রাইম পেয়স’-এ বলা হয়েছে, অপরাধীরা রাজনীতিতে প্রবেশ করে নিজেদের সুরক্ষা এবং অর্থের জন্য। ভোটাররা মনে করে, এরা ‘কাজ করিয়ে দেয়’।

বিশেষজ্ঞদের মতামত: একটি গভীর বিশ্লেষণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। মিলান ভাইশনাভ, কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো, বলেন, “ভোটাররা অপরাধীদের নির্বাচিত করে কারণ তারা মনে করে এরা আইনের উপরে গিয়ে কাজ করতে পারে এবং সুবিধা দিতে পারে।” তাঁর বইয়ে দেখা যায়, গণতন্ত্রের বিকাশের সাথে অপরাধ এবং রাজনীতির সম্পর্ক আরও জটিল হয়েছে।

প্রাক্তন চিফ ইলেকশন কমিশনার সুনীল অরোরা বলেন, “যতক্ষণ না দলগুলো অপরাধীদের টিকিট দেবে, ততক্ষণ গণতন্ত্র দুর্বল থাকবে।” ভির সাঙ্ঘভি, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এ লিখেছেন, “রাজনীতির অপরাধীকরণের অনেক কারণ রয়েছে, কিন্তু মূলত এটি দলগুলোর ‘উইনেবিলিটি’ নীতির ফল।”

অন্য একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, অপরাধী নেতারা অপরাধ বাড়ায়, বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক বলেন, “ভারতে অপরাধী রাজনীতিবিদরা অপরাধ বৃদ্ধি করে, যার মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধও অন্তর্ভুক্ত।” বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এটি একটি চক্র—অপরাধীরা নেতা হয়, আরও অপরাধ ছড়ায়।

জনগণের প্রতিক্রিয়া: সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ

জনগণের মধ্যে এই সমস্যা নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই। এক্স (পূর্বে টুইটার)-এ অনেকে লিখেছেন, “ভারতে অশিক্ষিত এবং অপরাধী ব্যাকগ্রাউন্ডের রাজনীতিবিদদের ভোট না দিলে দেশ উন্নত হবে। শুধু অবসরপ্রাপ্ত আইএএস/আইপিএস, পিএইচডি, এমবিএ-কে মন্ত্রী করা উচিত।” আরেকজন লিখেছেন, “অশিক্ষিত/ভিক্ষুক/দুর্নীতিগ্রস্ত/অযোগ্য/লজ্জাহীন/অপরাধী পরিণত রাজনীতিবিদরা দেশ চালাতে পারে না। শিক্ষিত, অভিজ্ঞ, সৎ নেতা দরকার।”

অনেকে বলছেন, “ভারতীয় আইনি ব্যবস্থা ছোট অপরাধীদের বড় দাদা বানিয়ে দেয়। পুলিশ, উকিল, বিচারকের মনোভাব দেখে তারা মনে করে অপরাধ করে পার পাওয়া সহজ।” বিহার নির্বাচন নিয়ে একজন লিখেছেন, “ভোটাররা অপরাধীদের নির্বাচিত করে কারণ তারা ‘কাজ করিয়ে দেয়’।” কেউ কেউ বলছেন, “সমাজ অপরাধীদের নেতা বানায় কারণ কঠোর ব্যক্তি নিয়ম কায়েম করতে পারে। কিন্তু গুরুতর অপরাধীদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া উচিত নয়।”

সোশ্যাল মিডিয়ায় #CleanPoliticsIndia ট্রেন্ড করছে, যেখানে যুবকরা বলছেন, “দুর্নীতি এবং অপরাধীকরণের কারণ বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা।” জনগণের এই ক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, পরিবর্তনের সময় এসেছে।

সমাধানের পথ: কী করা যায়?

এই সমস্যার সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ দরকার। প্রথমত, নির্বাচনী সংস্কার। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে অপরাধীদের টিকিট বন্ধ করতে হবে। ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টে ১ বছরে মামলা নিষ্পত্তি। দ্বিতীয়ত, ভোটার শিক্ষা। এনজিও এবং মিডিয়া মিলে ‘সিভিক এডুকেশন’ চালাতে হবে। তৃতীয়ত, দলগুলোতে স্বচ্ছতা—টিকিট বণ্টনে সততার স্কোরকার্ড। চতুর্থত, যুবকদের ভূমিকা—সোশ্যাল মিডিয়ায় #CleanPolitics ক্যাম্পেইন।

সমাজসেবীর রাজনীতি ফিরিয়ে আনুন

ভারতের গণতন্ত্র বাঁচাতে সমাজসেবীদের রাজনীতিতে আনতে হবে। গুন্ডা নেতারা উন্নয়ন থামায়, অপরাধ বাড়ায়, জনগণ ভোগে। মহাত্মা গান্ধীর সত্য-অহিংসা, জয়প্রকাশ নারায়ণের বিপ্লব—এই আদর্শ ফিরিয়ে আনুন। ভোটের আগে প্রার্থীর অতীত দেখুন, সততার পক্ষে দাঁড়ান। যদি আমরা না বদলাই, সমাজের উন্নয়ন অসম্ভব। আসুন, একসাথে লড়াই করি একটি স্বচ্ছ রাজনীতির জন্য।

Share This Article
Leave a Comment