হুগলির পাণ্ডুয়ায় SIR-এর অতিরিক্ত চাপে কাঁদলেন BLO সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়। ভাইরাল ভিডিওতে ‘আমি আর পারছি না’ বলে ভেঙে পড়া। নদিয়ায় BLO আত্মহত্যার ঘটনার পর রাজ্যে তোলপাড়। কাজের চাপ নিয়ে মমতার চিঠি CEC-কে। বিস্তারিত খবর।
হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া ব্লকে একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় স্কুলশিক্ষিকা এবং বুথ লেভেল অফিসার (BLO) সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় কাজের অতিরিক্ত চাপে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়েছেন। ভিডিওতে তাঁর কণ্ঠস্বর কাঁপছে: “আমি আর পারছি না।” এই ভিডিওটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভাইরাল হয়ে উঠেছে, যা শুধু স্থানীয় নয়, রাজ্যব্যাপী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রোগ্রামের অধীনে ভোটার তালিকা আপডেটের কাজে BLO-দের উপর চাপ বাড়ার অভিযোগ উঠেছে। এটি ঘটেছে ঠিক সেই সময়ে যখন নদিয়া জেলায় আরেক BLO-এর আত্মহত্যার খবর রাজ্যকে হিলিয়ে দিয়েছে।

গতকাল বিকেলে পাণ্ডুয়া ব্লক অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে কনসোল করার চেষ্টা করলেও, তাঁর কান্না থামছিল না। একটি ছোট ভিডিও ক্লিপে তাঁকে দেখা যাচ্ছে কীভাবে তিনি চিৎকার করে কাঁদছেন এবং কাজের চাপের কথা উল্লেখ করছেন। এই ভিডিওটি প্রথমে স্থানীয় ফেসবুক গ্রুপে শেয়ার হয় এবং পরে টুইটার (এক্স) এবং ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি লক্ষাধিক ভিউ পেয়েছে।
সুস্মিতা নিজে ভিডিওতে বলেছেন, “শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও আমি SIR-এর কাজ করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে ৩০০-এর বেশি ভোটারের নাম অনলাইনে আপডেট করেছি। কিন্তু ব্লক অফিসে ডেকে আবার সেখানে এন্ট্রি করতে বলা হলো। সার্ভার ডাউন থাকায় কাজ হলো না, তবু দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখা হলো।” এই অভিযোগগুলো শুধু সুস্মিতার নয়, রাজ্যের অনেক BLO-এর মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় কে?
সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় (৪২) হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া ব্লকের বাঁটিকা বৈচী গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে ১৩২ নম্বর বুথের BLO। তিনি একজন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষিকা এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের অধীনে এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী এবং দুটি সন্তানের মা। শিক্ষকতার পাশাপাশি BLO-এর কাজ তাঁর জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা তাঁকে একজন নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে চেনেন, যিনি সবসময় সময়মতো কাজ শেষ করার চেষ্টা করেন। তবে, SIR প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়।
BLO সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় Viral Video
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) হলো নির্বাচন কমিশনের একটি অভিযান, যার উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা আপডেট করা এবং নতুন ভোটার যোগ করা। ২০২৫ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে এটি শুরু হয়েছে। BLO-দের দায়িত্ব হলো ঘরে ঘরে গিয়ে ফর্ম সংগ্রহ করা, অনলাইনে এন্ট্রি করা এবং ভেরিফিকেশন করা। কিন্তু রাজ্যে এই প্রোগ্রাম অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। অ্যাপ-ভিত্তিক এন্ট্রি, সার্ভার সমস্যা এবং অসম্ভব ডেডলাইন BLO-দের মানসিক চাপ বাড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬০ হাজার BLO কাজ করছেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক বা পরিবেশনকর্মী।
কেন ভেঙে পড়লেন সুস্মিতা?
সুস্মিতার ঘটনা শুরু হয়েছে গত সপ্তাহ থেকে। তিনি নিজে জানান, শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি ৩০০-এর বেশি নাম আপডেট করেছিলেন। কিন্তু ‘লো পারফরম্যান্স’ দেখে ব্লক অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে সার্ভার ডাউন থাকায় কাজ হয়নি, তবু ৪-৫ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। বাড়ি ফিরে চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি ভেঙে পড়েন। স্থানীয় সূত্র বলছে, এমন অভিযোগ অনেক BLO-এর মধ্যে রয়েছে। টেকনিক্যাল সহায়তার অভাব এবং অফলাইন-অনলাইনের জটিলতা কাজকে কঠিন করে তুলেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সমর্থনের ঢেউ উঠেছে। হাজারো ইউজার #SupportBLO এবং #StopSIRPressure হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে পোস্ট করছেন। একজন ইউজার লিখেছেন, “এই মহিলা শিক্ষিকা, তার উপর এত চাপ! কমিশন কী ভাবছে?” অন্যদিকে, কিছু কমেন্টে BLO-দের দায়িত্বহীনতার অভিযোগও উঠেছে। তবে সামগ্রিকভাবে, এটি SIR-এর বিরুদ্ধে জনমত গঠনে সাহায্য করছে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, সুস্মিতাকে ডাকা হয়েছিল টেকনিক্যাল সহায়তার জন্য, কারণ তাঁর পারফরম্যান্স কম ছিল। “সার্ভার ডাউনের কারণে অপেক্ষা করতে হয়েছে, কিন্তু সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অসুস্থতার বিষয় বিবেচনা করা হবে,” বলা হয়েছে। তবে, কেন্দ্রীয় কমিশন এখনও এই নির্দিষ্ট ঘটনায় মন্তব্য করেনি।
রাজ্যে অনুরূপ ঘটনা: নদিয়ার হৃদয়বিদারক মৃত্যু
এই ঘটনা ঘটেছে ঠিক সেই সময়ে যখন নদিয়া জেলার চাপড়া এলাকায় BLO রিঙ্কু তারফদার (৫২) আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর সুইসাইড নোটে লেখা, “এই অমানুষিক কাজের চাপ আমি সহ্য করতে পারছি না। নির্বাচন কমিশন দায়ী।” তিনি একজন পাড়া শিক্ষিকা ছিলেন এবং SIR-এর চাপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এটি গত ২৪ ঘণ্টায় দ্বিতীয় BLO মৃত্যু – আগে মালবাজারে একজনের হার্ট অ্যাটাক। রাজ্যে SIR শুরু হওয়ার পর ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে অনেকেই চাপজনিত।
বিশেষজ্ঞ মতামত: কী বলছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা?
প্রখ্যাত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর অমিতাভ মিত্র বলেন, “SIR-এর উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু বাস্তবায়ন অসম্ভব। BLO-রা অস্থায়ী কর্মী, তাদের ট্রেনিং এবং সাপোর্ট নেই। এটি শুধু ভোটার তালিকা নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে খেলা।” মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় CEC গিয়ানেশ কুমারকে চিঠি লিখে বলেছেন, “এই অপরিকল্পিত অভিযান বন্ধ করুন। BLO-রা মানুষের সীমা অতিক্রম করছেন। আরও প্রাণহানির আগে ব্যবস্থা নিন।” বিজেপি নেতা বলছেন, “কমিশনের নিয়ম মেনে চলুন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করুন।”
এই ঘটনাগুলো শুধু ব্যক্তিগত নয়, সিস্টেমিক সমস্যা নির্দেশ করে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও রাজস্থান, কেরলে এবং গুজরাতে অনুরূপ মৃত্যুর খবর এসেছে। BLO-রা কম বেতন (মাসে ৫০০-১০০০ টাকা) এবং ছুটি ছাড়াই কাজ করছেন। ডিজিটাল ডিভাইড – গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সমস্যা – চাপ বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার গুণগত মান ক্ষুণ্ণ করবে। যদি BLO-রা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, তাহলে ভোটার তালিকা কতটা নির্ভরযোগ্য হবে? এটি শ্রমিক কল্যাণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্ন তুলেছে। রাজ্য সরকারের চাপ সত্ত্বেও কমিশনের সাড়া এখনও অস্পষ্ট।
সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়ের কান্না শুধু একটি ভিডিও নয়, এটি হাজারো BLO-এর নীরব কষ্টের প্রতীক। রাজ্যে এই সংকটের মুখে নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে – ডেডলাইন বাড়ানো, ট্রেনিং বাড়ানো এবং মানসিক স্বাস্থ্য সাপোর্ট দেওয়া। অন্যথায়, গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। স্থানীয়রা এখন সুস্মিতার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, গণতন্ত্রের সেবায় মানুষের জীবনের মূল্য কতটা?