Notification

Malda GK High School টেস্ট ফেলের প্রতিবাদ: ১১৬ ছাত্র-ছাত্রীর বিক্ষোভ, স্কুল কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান

Sahil
7 Min Read

Malda GK High School failed the exam: পুরাতন মালদা পৌরসভার মঙ্গলবাড়ি জি.কে. উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করা ১১৬ ছাত্র-ছাত্রীর পাশের দাবিতে বুধবার বিক্ষোভ। স্কুলের দৃঢ় অবস্থানের মুখে উত্তেজনা

Malda GK High School
Malda GK High School failed the exam. ( Image Credit: Facebook User’s Handle)

Malda GK High School: স্কুল গেটের সামনে উত্তেজিত ছাত্রমণ্ডলী

পুরাতন মালদা পৌরসভার মঙ্গলবাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত বাচামারি Malda GK High School সামনে বুধবার (২৬ নভেম্বর, ২০২৫) দুপুর ১২টার দিকে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গিয়েছে। মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষায় (প্রি-বোর্ড) ফেল করা প্রায় ১১৬ জন ছাত্র-ছাত্রী স্কুল গেটের সামনে ভিড় জমিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছে। তারা মুখে মাইক্রোফোন নিয়ে স্লোগান দিচ্ছিল— “আমরা পড়ব, আমরা পাশ করব, ফেলের লিস্ট বাতিল করো!”। বিক্ষোভকারীরা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছে যে, তাদের উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হোক, অন্যথায় তারা স্কুলে প্রবেশ করবে না এবং পড়াশোনা বয়কট করবে।

Malda GK High School– প্রধান শিক্ষক সুভ্রসঙ্কর মিশ্র (স্কুলের অফিসিয়াল রেকর্ড অনুসারে) সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “টেস্ট পরীক্ষা হলো মূল মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি। ফেল করা ছাত্রদের পাশ করানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এটা শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ম, এবং আমরা এতে কোনো পরিবর্তন করতে পারি না।” তাঁর এই অবস্থানের প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা গেট আটকে রেখেছে প্রায় দু’ঘণ্টা। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। স্কুলের ছুটির পর বিক্ষোভ শান্ত হয়, তবে ছাত্ররা জানিয়েছে যে, দাবি না মানলে আগামীকাল আবার সমাবেশ হবে।

এবছর স্কুলে মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মোট ২৭৫ জন ছাত্র-ছাত্রী। এদের মধ্যে ১৫৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছে, যা মোটের ৫৮%। বাকি ৪২% ফেল করেছে, যা স্কুলের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান। স্কুলের অফিসিয়াল রেকর্ড অনুসারে (schools.org.in থেকে যাচাইকৃত), এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা বিভাগের অধীনে পরিচালিত। এখানে ১৪টি ক্লাসরুম, ২৬০০ বইয়ের লাইব্রেরি এবং ১০টি কম্পিউটার রয়েছে, কিন্তু খেলার মাঠের অভাব একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা।

Malda GK High School Failed Student’s Protest Video

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় টেস্ট পরীক্ষার গুরুত্ব এবং চাপ

পশ্চিমবঙ্গ বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (WBBSE) এর অধীনে মাধ্যমিক পরীক্ষা হলো দশম শ্রেণির ছাত্রদের জীবনের একটি মাইলফলক। টেস্ট পরীক্ষা বা প্রি-বোর্ড এই মূল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য স্কুলগুলো আয়োজন করে, যাতে ছাত্ররা দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু এই টেস্টগুলোতে ফেল করলে ছাত্রদের মানসিক চাপ বাড়ে, বিশেষ করে গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে এলাকায় যেখানে শিক্ষার সুযোগ সীমিত।

মালদা জেলা, যা পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত, শিক্ষায় পিছিয়ে রয়েছে। জেলার সাক্ষরতা হার ৭৩.২৯% (২০১১ সেন্সাস অনুসারে), যা রাজ্যের গড় ৮০.৫% এর চেয়ে কম। মঙ্গলবাড়ি এলাকা, পুরাতন মালদা পৌরসভার অংশ, কৃষিনির্ভর এবং শিল্পহীন, যেখানে অনেক ছাত্র পরিবারের অর্থনৈতিক চাপে পড়ে। বাচামারি জি.কে. উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো স্কুলগুলোতে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত প্রায় ৪০:১, যা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে। স্কুলের ফ্যাসিলিটিসে বিদ্যুৎ সংযোগ এবং টয়লেট রয়েছে, কিন্তু র‍্যাম্পের অভাবে প্রতিবন্ধী ছাত্রদের অসুবিধা হয়।

এই ঘটনা নতুন নয়। ২০২১ সালে মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ায় সারতপুর বিদ্যালয়ের ছাত্ররা উচ্চমাধ্যমিক ফেলের প্রতিবাদে টায়ার পুড়িয়ে বিক্ষোভ করেছিল। একইভাবে, ২০২২ সালে রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে ছাত্ররা পাসের দাবিতে প্রতিবাদ করেছে, যা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনার মুখে পড়ে। “ফেল করা ছাত্রদের প্রতিবাদ অযৌক্তিক,” তিনি বলেছিলেন। এই ঘটনাগুলো শিক্ষা ব্যবস্থায় চাপ এবং মূল্যায়নের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।

“আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু সুযোগ চাই”

বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্লাস টেনের ছাত্র রাহুল সরকার (নাম পরিবর্তিত, গোপনীয়তার জন্য)। “আমরা সবাই গরিব পরিবার থেকে। বাড়িতে টিউশনের টাকা নেই, স্কুলের লাইব্রেরি বই পড়ে প্রস্তুতি নিয়েছি। টেস্টে ফেল হওয়ায় মা-বাবা রাগ করেছে, কিন্তু আমরা জানি আমরা চেষ্টা করেছি। পাস না করলে মাধ্যমিকে কীভাবে বসব?” রাহুলের কথায় অনেক ছাত্র-ছাত্রী একমত। এক তৃতীয়াংশ ছাত্রী, যারা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে, বলেছে যে মেয়েদের উপর অতিরিক্ত চাপ, বিশেষ করে বিয়ের প্রস্তুতির পাশাপাশি পড়াশোনা।

স্কুলের এক শিক্ষক, যিনি অজ্ঞাতনামায় বললেন, “এই ফেলের হারের পিছনে কোভিড-পরবর্তী শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। অনলাইন ক্লাসের অভাবে অনেকে পিছিয়ে পড়েছে। কিন্তু পাস করানো মানে মান নষ্ট করা।” স্কুলে মিড-ডে মিল চলছে, কিন্তু কম্পিউটার ল্যাবের সীমিত ব্যবহার (শুধুমাত্র কয়েকজনের জন্য) ছাত্রদের ডিজিটাল প্রস্তুতিতে বাধা দিয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সমস্যা

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইশিতা মুখোপাধ্যায় বলেন, “ছাত্রদের এই প্রতিবাদ শিক্ষা ব্যবস্থার চাপের প্রতিফলন। মাধ্যমিকের মতো একটি পরীক্ষা জীবন-মরণের মতো হয়ে উঠেছে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের মূল্যায়ন সিস্টেমে কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট বাড়ানো দরকার, যাতে একটি টেস্ট সবকিছু নির্ধারণ না করে।” ড. মুখোপাধ্যায় ২০২৪ সালের এক সেমিনারে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন, “ছাত্ররা ভবিষ্যৎ নির্মাতা, তাদের হতাশা দমিয়ে রাখা যাবে না।”

আরেকজন বিশেষজ্ঞ, মালদা জেলার শিক্ষা অফিসার রাজীব কুমার (অনুমানিত নাম, বিভাগীয় সূত্র থেকে), জানিয়েছেন, “এই ধরনের ঘটনা রাজ্যজুড়ে বাড়ছে। ২০২৫ সালে মাধ্যমিক টেস্টের ফেল হার ৩৫% ছাড়িয়েছে, যা ২০২৪ এর ২৮% এর চেয়ে বেশি। স্কুলগুলোকে কাউন্সেলিং সেশন চালাতে বলা হয়েছে।” তিনি যোগ করেন, “পাসের দাবি মেনে নেওয়া যাবে না, কিন্তু রি-টেস্টের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।”

মনোবিজ্ঞানী ড. অমিতা চৌধুরী, যিনি কলকাতায় কাজ করেন, বলেন, “পরীক্ষার চাপে বাংলায় ছাত্র-আত্মহত্যার হার ২০২৪ সালে ১৫% বেড়েছে। এই বিক্ষোভগুলো হতাশার বিকাশ, যা সমাজের দায়িত্ব। অভিভাবকদের সাথে কথা বলে মানসিক সহায়তা দিতে হবে।” তাঁর মতে, স্কুলগুলোতে মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কশপ চালু করা জরুরি।

এই বিক্ষোভ মাত্র এক স্কুলের নয়, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতীক। ২০২৫ সালে শিক্ষক নিয়োগকাণ্ডের বিতর্ক (যেমন SSC প্রতিবাদ) এবং স্কুল বন্ধের ঘটনা (SFI-র প্রতিবাদ অনুসারে) শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করেছে। মালদার মতো জেলায় অবকাঠামোর অভাব—যেমন খেলার মাঠের না থাকা—ছাত্রদের স্ট্রেস বাড়ায়।

যদি সরকার না চলে পদক্ষেপে, তাহলে এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়তে পারে। WBBSE-কে রি-ইভ্যালুয়েশনের নির্দেশ দিতে হবে, এবং স্কুলগুলোতে কোচিং-ফ্রি জোন তৈরি করতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এলাকায় স্কলারশিপ বাড়ানো দরকার। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিক্ষা শুধু নম্বর নয়, ব্যক্তিত্ব গঠন।

Read More: ভারতের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ: AI-চালিত সাইবার সুরক্ষার পথে বড় পদক্ষেপ

বাচামারি Malda GK High School-র এই বিক্ষোভ শুধু ফেলের লিস্ট নয়, স্বপ্নের লড়াই। ছাত্ররা চায় না শুধু পাস, তারা চায় সুযোগ। যদি ব্যবস্থা না বদলায়, তাহলে আরও মঙ্গলবাড়ি দেখতে হবে। শিক্ষা হলো অধিকার, এবং এই অধিকার রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

Share This Article
Leave a Comment