পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের SIR প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক চলছে জোরালো। মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলোতে হাজার হাজার ভোটারের নাম ডিলিট হচ্ছে বা আদালতে চলছে মামলা, কিন্তু হিন্দু ভোটারদের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ কেন কম? এই প্রশ্ন উঠছে সবার মনে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা পরিষ্কার করার নামে নির্বাচন কমিশনের (ECI) চালানো স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়া এখন রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বা আইনি লড়াইয়ের মধ্যে আটকে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন শুধু মুসলিম ভোটারদের নামগুলোই বেশি করে কোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছে? আর হিন্দু ভোটারদের ক্ষেত্রে এমন অসমতুল্যতা কেন দেখা যাচ্ছে না? নির্বাচন কমিশনের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর কী? আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা লজিকালভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখব, যাতে পাঠকরা সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেন।

SIR কী এবং কেন শুরু হলো এই প্রক্রিয়া?
নির্বাচন কমিশনের SIR হলো একটি বিশেষ অভিযান, যা ভোটার তালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত বা ডুপ্লিকেট নামগুলো বাদ দেওয়ার জন্য চালানো হয়। পশ্চিমবঙ্গে এটি ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে শুরু হয়েছে, বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে। কমিশনের দাবি, এতে ৬.২ মিলিয়নেরও বেশি নাম ডিলিট হয়েছে, যা ‘ভূত’ ভোটার বা অবৈধ প্রবেশকারীদের বাদ দেওয়ার ফল। কিন্তু এখানেই সমস্যা শুরু। কারণ, এই ডিলিশনের পরিসংখ্যান দেখলে মনে হয়, এটি শুধু পরিষ্কার নয়, বরং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করছে।
উদাহরণস্বরূপ, মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলোতে পেন্ডিং কেসের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মুর্শিদাবাদে ১১ লক্ষেরও বেশি, মালদায় ৮ লক্ষের কাছাকাছি, এবং উত্তর দিনাজপুরে ৪.৮ লক্ষ কেস আটকে আছে। এই তিন জেলা মিলে ২.৪ মিলিয়নেরও বেশি ভোটারের ভাগ্য আদালতের হাতে। এদিকে, হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় এমন অসমানুপাতিক ডিলিশনের খবর কমই শোনা যাচ্ছে। একটি স্টাডি অনুসারে, মুসলিম-অধ্যুষিত আসনগুলোতে ম্যাপিং ভালো হয়েছে, যার ফলে হিন্দু শরণার্থী মাতুয়াদের উপর প্রভাব পড়েছে, কিন্তু ডিলিশনের হারে মুসলিম এলাকাই এগিয়ে। এখানে লজিক সহজ: যদি SIR সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তাহলে ধর্মভিত্তিক জেলাগুলোতে কেন এমন পার্থক্য? নির্বাচন কমিশনের ভোটার ডাটাবেসে ধর্মের তথ্য নেই বলে তারা দাবি করে, কিন্তু পরিসংখ্যান তো স্পষ্ট বলছে অন্য কথা।
অভিযোগের ঝড়: মুসলিম ভোটাররা কেন টার্গেট?
তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এবং সিপিআই(এম)-এর নেতারা দাবি করছেন, এটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। আইনজীবী মিজানুর রহমানের মতো ব্যক্তিরা বলছেন, মুসলিম ভোটারদের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। মুর্শিদাবাদের কালিকাহারা গ্রামে ৭০-এর বেশি মুসলিম ভোটারের নাম বাল্ক ফর্ম-৭ দিয়ে ডিলিট করা হয়েছে, যেখানে তাদের মৃত বা অ-ভারতীয় বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি জীবিত লোকদের মৃত বলে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, এবং কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। স্থানীয় বিজেপি নেতারা এর সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ, যদিও তারা অস্বীকার করছেন।
সন্দেশখালিতে হাজার হাজার মুসলিম ভোটারের নাম কেটে ফেলা হয়েছে, এবং কমিশন বলছে তারা ‘ভারতীয় নয়’। ফুরফুরা শরীফে প্রতিবাদ সভায় পীরজাদা সানাউল্লাহ বলেছেন, “ভুল তো নির্বাচন কমিশনের, কেন আমাদের নামে নোটিশ?” এই অভিযোগগুলো শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং লজিকাল: যদি SIR-এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার করা, তাহলে কেন শুধু সীমান্তবর্তী মুসলিম এলাকায় এত বেশি ডিলিশন? বিজেপির ‘অবৈধ প্রবেশকারী’ অভিযানের সঙ্গে এর যোগসূত্র স্পষ্ট, যা গণতন্ত্রের ভিত্তি ভোটাধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নির্বাচন কমিশনের প্রত্যুত্তর: পক্ষপাত নয়, নিয়ম মেনে চলা
নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগকে ‘সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে খারিজ করেছে। তাদের দাবি, ভোটার তালিকায় ধর্মের কোনো তথ্য নেই, তাই মুসলিমদের টার্গেট করার প্রশ্নই ওঠে না। বिहারের SIR-এও একই দাবি করা হয়েছে, যেখানে ৬৫ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে মৃত্যু, স্থানান্তর বা ডুপ্লিকেটের কারণে। কমিশন বলছে, সব ডিলিশনে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ৫.৪৬ লক্ষ নাম ডিলিট হয়েছে, এবং ৬০ লক্ষ কেস পেন্ডিং কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায়।
কিন্তু এখানে লজিকের ফাঁক: যদি নোটিশ সবাইকে পৌঁছায়, তাহলে কেন মুর্শিদাবাদের মতো এলাকায় অভিযোগ উঠছে নোটিশ না পাওয়ার? একটি টুইটে বলা হয়েছে, ডিলিশন লিস্টে হিন্দু ভোটার বেশি, কিন্তু অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে মুসলিম বেশি। এটি স্বীকার করলে প্রশ্ন হয়, কেন মুসলিম এলাকায় অ্যাডজুডিকেশন বেশি? কমিশনের সফটওয়্যারে নামের বানান ভুলের উদাহরণও আছে—এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর নামটিই ভুল! এতে সন্দেহ জাগে, প্রক্রিয়াটি কতটা নির্ভুল।
আদালতের হস্তক্ষেপ: স্বচ্ছতার দাবি
সুপ্রিম কোর্টে SIR নিয়ে শুনানি চলছে। বিচারপতি বাগচী নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন, সামান্য নামের পার্থক্যে কেন নোটিশ? কোর্ট কমিশনকে স্বচ্ছতার নির্দেশ দিয়েছে—যোগ করা বা বাদ দেওয়া নামের লিস্ট প্রকাশ করতে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় মুসলিম ভোটারদের নাম চ্যালেঞ্জ করা হলে হিন্দু মাতুয়া সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে কেন না? এই অসমতা কোর্টের সামনেও উঠেছে।
লজিকাল বিশ্লেষণ: নিরপেক্ষতা কোথায়?
যদি SIR সত্যিই গণতান্ত্রিক হয়, তাহলে সব ভোটারের জন্য সমান নিয়ম হওয়া উচিত। কিন্তু পরিসংখ্যান দেখলে মনে হয়, মুসলিম ভোটারদের উপর চাপ বেশি। হিন্দু ভোটারদের ডিলিশন কম হলে প্রশ্ন ওঠে, কেন? এটি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য? নির্বাচন কমিশনকে উত্তর দিতে হবে: হিন্দু ভোটারদের জন্য কী প্রশ্ন আছে? যদি না থাকে, তাহলে এটি পক্ষপাতের প্রমাণ। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা পরিষ্কার হোক, কিন্তু কারো ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া যাক না।
উপসংহার: স্বচ্ছতার দাবি জোরদার করুন
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় SIR ভোটার রিভিশন একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, কিন্তু এর ফলে যদি মুসলিম বা হিন্দু—কোনো সম্প্রদায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হবে। নির্বাচন কমিশনকে সকলের কাছে উত্তরদায়ী হতে হবে। পাঠকদের অনুরোধ, আপনার ভোটার আইডি চেক করুন এবং অভিযোগ থাকলে তাৎক্ষণিক রিপোর্ট করুন। শুধু তবেই সত্যিকারের ‘পরিষ্কার’ ভোটার তালিকা সম্ভব।