পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ায় বড় ধাক্কা খেলেন রাজ্যের এক প্রাক্তন সাংসদ। ২০০৯ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন সোশ্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার (এসইউসি)-এর ডা. তরুণ মণ্ডল। পেশায় হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক তরুণ মণ্ডলের নাম দ্বিতীয় দফার তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ থেকে সরাসরি ‘বাদ’-এর খাতায় চলে গিয়েছে।
ডা. তরুণ মণ্ডলের নাম বাদ।
২০০৯ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর লোকসভা কেন্দ্র থেকে সোশ্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অফ ইন্ডিয়া (এসইউসি)-এর প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন ডা. তরুণ মণ্ডল। কংগ্রেস-তৃণমূল জোটের সমর্থন নিয়ে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। পেশায় হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক তরুণ মণ্ডল বর্তমানে দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা এলাকার বাসিন্দা। তাঁর ভোটার নম্বর ছিল সেই বিধানসভার ২৭৯ নম্বর বুথে।
শুক্রবার মধ্যরাতে নির্বাচন কমিশন দ্বিতীয় দফার সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকা তরুণ মণ্ডলের নাম সরাসরি ‘বিয়োজন’ বা বাদ পড়া ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অথচ তাঁর স্ত্রী মহুয়া মণ্ডলের নাম ‘বিবেচনাধীন’ থেকে বৈধ ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।
তরুণ মণ্ডলের প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগ
শনিবার সকালেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ডা. তরুণ মণ্ডল। তিনি একটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে তাঁর সমস্যার কথা জানান। সাক্ষাতের পর তরুণ মণ্ডল সাংবাদিকদের বলেন, “আমি সরকারি চাকরি করতাম। এখন পেনশন পাই। আমি একসময় সাংসদ ছিলাম। আমার পরিচয় প্রমাণের জন্য এক ডজনেরও বেশি নথি জমা দিয়েছি। কিন্তু সিইও সাহেব বললেন, এখন যা করার ট্রাইবুনাল করবে। তাঁর কথাবার্তা শুনে মনে হলো তিনি একেবারে নির্বিকার।”
তরুণ মণ্ডল আরও জানিয়েছেন যে, সিইও-কে স্মারকলিপি দেওয়ার পর তিনি লোকসভার বর্তমান অধ্যক্ষ ওম বিড়লা এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চিঠিতে তিনি এক ডজন নথি সংযুক্ত করবেন। তাঁর বক্তব্য, “আমার মতো একজন প্রাক্তন সাংসদের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে রাজ্যের প্রান্তিক ও গরিব মানুষের ভোটাধিকার কীভাবে রক্ষা পাবে? এটা পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা বলেই মনে হচ্ছে।”
SIR প্রক্রিয়ার পটভূমি
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) চলছে। এই প্রক্রিয়ায় বিবেচনাধীন নামগুলি যাচাই-বাছাই করছেন বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা। পুরো প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধান করছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল।
তরুণ মণ্ডলকে এসআইআর-এর খসড়া তালিকা প্রকাশের পর শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। তিনি সেখানে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছিলেন। তারপর তাঁর নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় উঠলেও, দ্বিতীয় দফার তালিকায় তা বাদের খাতায় চলে গেছে। তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, প্রাক্তন সাংসদ হিসেবে তিনি ট্রাইবুনাল পর্যন্ত লড়াই করে নাম ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে — যারা সাধারণ গরিব-প্রান্তিক মানুষ, তাদের নাম যদি এভাবে বাদ পড়ে, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে?
তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থান
এদিকে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসেরও অনেক প্রার্থী ও নেতার নাম এখনও বিবেচনাধীন তালিকায় রয়েছে। গত বুধবার তৃণমূল কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালকে চিঠি লিখে দ্রুত হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়েছে। দলের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১১ জন প্রার্থীর নাম বিবেচনাধীন তালিকায় রয়েছে।
তবে শুক্রবার প্রকাশিত তালিকায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে তৃণমূল। শ্যামপুকুরের তৃণমূল প্রার্থী ও রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা এবং বীরভূমের হাসনের তৃণমূল প্রার্থী তথা জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখের নাম বিবেচনাধীন থেকে বৈধ তালিকায় স্থান পেয়েছে। এখনও ৯ জনের ভবিষ্যৎ ঝুলে রয়েছে।
SIR প্রক্রিয়া নিয়ে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
পশ্চিমবঙ্গে SIR প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই বিতর্ক চলছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, বিভিন্ন জেলায় লক্ষ লক্ষ নাম বিবেচনাধীন বা বাদের তালিকায় চলে গেছে। বিরোধী দলগুলি অভিযোগ করছে যে, এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অন্যদিকে, কমিশনের দাবি — এটি ভুয়ো ভোটার বাদ দিয়ে তালিকাকে আরও নির্ভুল করার প্রয়াস।
তরুণ মণ্ডলের ঘটনা এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ একজন প্রাক্তন সাংসদ, যিনি সরকারি নথি, পেনশন, সাংসদ হিসেবে পরিচয় — সবকিছু থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ পড়েছেন। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রক্রিয়ায় কোথাও গলদ থাকতে পারে।
তরুণ মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তিনি শুধু নিজের নাম ফিরিয়ে আনার জন্যই নয়, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার জন্যও লড়াই চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেছেন, “যদি আমার মতো একজনের এই অবস্থা হয়, তাহলে গ্রামের সাধারণ মানুষ কোথায় যাবেন? তাদের কথা কে শুনবে?”
পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচনের আগে SIR প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। প্রাক্তন সাংসদ তরুণ মণ্ডলের নাম বাদ পড়ার ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে ট্রাইবুনাল গঠনের পর আবেদনের ভিত্তিতে অনেকের নাম ফিরে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।